This Is Scrolling Text with scrollamount="6"

অচিনপাখি ডিজিটালে আপনাকে স্বাগত । লেখা পাঠান এই মেলে -achinpakhipotrika@gmail.com

Wednesday, January 9, 2019



কবিতার ঈশ্বরের আশীর্বাদে ঋদ্ধ অচিনপাখি

নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীএকটি নাম মাত্র কিন্তু আমাদের কাছে তিনি ঈশ্বর, কবিতার ঈশ্বর বাংলা কবিতার ছন্দের সাথে যাদের হৃদস্পন্দন অভিন্ন নয় তাদের কাছে তো তিনি ঈশ্বর-  কি বিরাট এক মানুষ, কি বিশাল তাঁর ব্যাপ্তি, কি প্রবল তাঁর দ্যুতি
বাংলা সাহিত্যের ভাণ্ডার কখনই অপূর্ণ নয় নানা সময়ে নানা ক্ষণজন্মা কবি, সাহিত্যিক তাঁদের অমর কলমের জোরে এ বঙ্গভান্ডার পূর্ণ করেছেন কানায় কানায়, তারই মাঝে নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী এক মহীরুহ  চল্লিশের দশকের টালমাটাল সময়ের নানান অনুপুঙ্খ, ভালোবাসার নির্জনতায় অমোঘ প্রবাহ আর তারই সাথে আটপৌরে জীবনের অলিন্দ থেকে খুঁজে আনা কাব্যবস্তু সোনার অক্ষরে বাঁধিয়ে তিনি আমাদের নতুন করে কবিতা পড়তে শিখিয়েছেন, চিনতে শিখছেন সর্বপরি লিখতে শিখিয়েছেন  
তাঁরকবিতার ক্লাসএই আমাদের কবিতা শেখা  এতো দরদী শিক্ষক, এতো মরমী শুভাকাঙ্ক্ষী বাংলা ভাষার কবিতা অনুরাগী পাঠকেরা নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী ছাড়া বোধহয় আর কাউকে পায়নি  তাঁর ক্লাসেই আমাদের ছন্দ শেখা, কবিতার গ্রন্থন শেখা, কবিতার আবরণ, ব্যঞ্জনা শেখা  ‘আমি শুধু কবি, দোষ নেই কিছু আর’ এই সামান্য স্বীকারোক্তিকেই তিনি অসামান্য করেছেন তাঁর অক্ষয় কলমের আঁচড়ে ।  
আটপৌরে কথা, সাদামাটা জীবন আর তীব্র এক অন্তর্ভেদী দৃষ্টি এই হাতিহার করেই তিনি কখনও রোদ্দুর হয়ে উঠতে চাওয়ার বাসনা রাখা কোন অমলকান্তিকে চিনেছেন, কখনও চলমান শহুরে ব্যস্ততাকে স্তব্ধ করে দেওয়া উলঙ্গ গরীব শিশুর বুকে কোলকাতার যিশুকে খুঁজে পেয়েছেন আবার কখনও নির্লজ্জ সমাজের সামনে তীব্র আশ্লেষে কোন শিশুর কণ্ঠ মুখরিত করতে চেয়েছেন প্রতিবাদে ‘রাজা তোর কাপড় কোথায়’ ।
তিনি কবিতার ঈশ্বর । আচিনপাখি সে ঈশ্বরের দু’হাত ভরা স্নেহাশিস মাথায় পেয়ে ভাগ্যবান হয়েছে । আমাদের প্রকাশিত প্রথম কাব্য সংকলন ‘একশো কবিতায় প্রেম’এর প্রথম কবিতাটিই নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর লেখা মানব-সংসারে । গত ২৩শে নভেম্বর তাঁর বালিগঞ্জের বাসভবনে অচিনপাখির পক্ষ থেকে তাঁকে ‘জীবন কৃতি সম্মাননা’ তুলে দেওয়া হয় । তিনি তখন অসুস্থ, চলাফেরা করতে অক্ষম, প্রায় বাকশক্তি হীন – তবু তিনি এলেন, ঠিক যেমন তিনি চেয়েছিলেন ‘আসবার ছিল না কথা, তবুও সম্রাট এসেছেন’  
আমরা তাঁর হাতে তুলে দিলাম আমাদের প্রকাশিত কাব্য সংকলনটি । দুর্বল দৃষ্টির ওপর জোর দিয়ে বইটির পাতা উল্টে পড়লেন । তাঁকে উত্তরীয়, পুস্পস্তবকে বরণ করে নিতে হাসলেন সেই বিভাময় দ্যুতিতে । কাঁপা কাঁপা হাতে শারীরিক অক্ষমতাকে জয় করে অচিনপাখির জন্য লিখে দিলেন দু’কলম শুভেচ্ছা । দু’হাত তুলে আশীর্বাদ করলেন, শুধু আমাদেরই নয় সাহিত্যচর্চার সাথে যুক্ত সকলকেই ।  ঈশ্বরের কাছ থেকে পাওয়া সে আশীর্বাদই আমাদের আগামীর পথচলার পাথেয় ।  ঈশ্বরের পায়ে হাত ছুঁয়ে প্রণাম করতে পেরেছি এ আমাদের আজীবন অমুল্যরতন ।
তারই প্রায় এক মাস পড়ে ২৫শে ডিসেম্বর প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে তিনি আমাদের এই মাটির পৃথিবী ছেড়ে আরও ঊর্ধ্বলোকে যাত্রা করলেন । তাঁর নশ্বর দেহটি নেই কিন্তু তিনি থাকলেন চির অমর হয়ে । আমাদের কবিতার ক্লাস শেষ হয়নি । আমাদের ভুল ভ্রান্তিতে যখনই অসহায় হয়ে পড়বো জানি তাঁর অক্ষর দেবে নতুন পথের দিশা ।  অনেক নতুন কবিরা আরও লিখবে কবিতা, ছন্দে ভুল করা কেউ শুধরে নেবে তার ছন্দ ।  কবিতার ঈশ্বর, কবিতার শিক্ষক সৃষ্টির নানা পথের হদিশ রেখে গেছেন অকাতরে ।  
তাঁর আশীর্বাদ সবসময় আমাদের সাথে আছে, থাকবে সামান্য মৃত্যুতে তিনি সমাপ্ত হয়ে যাওয়ার নয় । তিনি অফুরান, অনন্ত ।  বাংলার সাহিত্য অনুরাগী উত্তরসূরিরা কালে কালে, স্থানে স্থানে তাঁকে কাছে পাবেন, তাঁর সৃষ্টিতে ঋদ্ধ হবেন তাঁর চরনে সাজিয়ে দেবেন শ্রদ্ধাঞ্জলি । অচিনপাখি ভাগ্যবান যে কবিকে জীবনের শেষ সম্মাননা আমরা হাতে তুলে দিতে পেরেছি ।  অচিনপাখির উড়ান পথে তাঁর আলো পথ দেখাবে আজীবন এ বিশ্বাস আমাদের অটুট ।  তিনি আলোর দিশারী, মুক্ত হাওয়ার আহ্বায়ক । তিনি নিজেই সে অভিলাষ রেখে গেছেন –

এখন যাবার বেলা, এখন জানালা বন্ধ করে
থাকা ঠিক নয় ।
যতই এগিয়ে আসে যাবার সময়,
ততই মলিন এই ঘরে
জানালার পথে যেন আসে আরও আলো, আরও হাওয়া ।
অন্ধকারে কে নেবে বিদায় ।
যে যাবে সে পিছনে খানিকটা আলো দেখে যেন যায়
তা নইলে কীসের জন্য যাওয়া ।